sinkin

লেখক, সৌরভ রায় :

আমাদের দেশে কতইনা অদেখা অজানা জায়গা আছে। যেখানে না গেলে তার সৌন্দর্য্য উপলব্ধি করা যায় না। সম্প্রতি সেরকমই এক অজানা জায়গা থেকে ঘুরে এলাম আমরা। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং জেলার অন্তর্ভুক্ত “সিকসিন” নামের একটি ছোট্ট গ্রাম। জায়গাটি মংপু থেকে ৬ কিমি উপরে অবস্থিত। যাঁরা প্রকৃতির সৌন্দর্য্যকে উপভোগ করতে চান তাঁরা অবশ্যই একবার এই জায়গা থেকে ঘুরে আসতে পারেন। এখানে সকালের ঘুম ভাঙে নানা রকম পাখির মিষ্টি ডাকে। যাঁরা প্রকৃতির ছবি তুলতে ভালো বাসেন তাঁদের জন্যও জায়গাটি একদম আদর্শ। 

সকালের গরম চায়ের পেয়ালা হাতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে চোখের সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য্য যেন মনোমুগ্ধ করে তোলে। এরপর ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়ুন নানা রঙের পাখির ছবি তোলার জন্য।

সূর্য্য অস্ত যাবার পর মনে হয় আকাশ যেন কালো চাদরে চারিদিক থেকে আমাদের জড়িয়ে আছে আর নিচের ছোট ছোট গ্রাম গুলোর আলো দেখে মনে হয় আকাশের তারাগুলো যেন পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে। এই সৌন্দর্য্য নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

এখানকার মানুষের আতিথেয়তা এতটাই মনকে ছুঁয়ে যায় যে মনে হয় যেন বার বার এখানে আসি।  এখান থেকে আপনি হয় দার্জিলিং নয়তো লামাহাটা তিনচুলের দিক থেকেও সারাদিনের জন্য ঘুরে আসতে পারেন। সিকসিন জায়গাটি সেঞ্চল ওয়াইল্ড লাইফের অন্তর্ভুক্ত। এখানে একটি জঙ্গল ট্রেকও আছে যেটা খুব রোমাঞ্চকর। 

সকালে NJP তে নেমে গাড়ি করে গেলাম সিকসিনের উদ্দেশ্যে, যাবার পথে সেবক মায়ের দর্শন করে নিলাম। সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা সময় লাগে সিকসিন পৌঁছাতে। মংপু থেকে যত উপরে উঠছি ঘন মেঘ ততই যেন আমাদের ঘিরে ধরতে লাগল। গাড়ি থেকে আমরা যখন নামলাম চারিদিক শুধু মেঘ আর মেঘ তার সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। ওখানে দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সেঞ্চল ওয়াইল্ড লাইফের সফরে।

প্রায় দেড় ঘন্টা মতো পথের এই ট্রেকিং। একদিকে পাহাড়ের জঙ্গল অন্য দিকে খাদ আর মাঝখানে সরু মাটির রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চললাম। বেশ একটা গা ছমছমে ভাব আর বেশ রোমাঞ্চকর একটা অনুভূতি হতে লাগল। আমরা যখন জঙ্গলের মাঝামাঝি, তখন মেঘ যেন পুরো রাস্তাটা আমাদের ঘিরে আটকে রেখেছে বলে মনে হল। সামনে পেছনে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, তবুও আমরা না থেমে গাইডদের সঙ্গে এগিয়ে চললাম।

এই জঙ্গলে রয়েছে চিতা বাঘ, ভাল্লুক, বন্য শূকর ইত্যাদি। আমাদের ট্রেকিং যখন শেষ হল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি বিকেল তখন ৫ টা বেজে গেছে। হেঁটে আমাদের হোমস্টেতে ফিরতে আরও প্রায় ১৫-২০ মিনিটের মতো সময় লাগবে। পুরো রাস্তা মেঘে ঢাকা সামনে পিছনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, কোনও রকমে আসতে আসতে রাস্তার ধার দিয়ে হেঁটে আমরা বাড়ি ফিরলাম। 

পরের দিন সকালে জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম লামাহাটা পার্ক-এর উদ্দেশ্যে, বেশ সুন্দর সাজানো এই পার্কটি, বেশ কিছুক্ষণ এখানে কাটিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম পরের গন্তব্য লাভার্স পয়েন্ট এবং তার সাথে তিস্তা ও রঙ্গীত নদীর সঙ্গম স্থল দেখতে।  এরপর পেশক চা বাগান এবং তিনচুলে দেখে বিকেলের মধ্যে আমরা ফিরে এলাম। ফিরে আসার দিন বেরোনোর আগে বাড়ির মালকিন

আমাদের সবাইকে উত্তরীয় পরিয়ে দিয়ে সন্মান দিলেন। এই সফরে এটা আমাদের কাছে সব থেকে একটা বড়ো পাওনা। ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা প্রথমে গেলাম মংপুতে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি। খুব সুন্দর ছোট্ট বাড়িটি, কত অজানা ইতিহাসের কথা ওখান থেকে জানতে পারলাম আমরা। এর পর যোগী ঘাট হয়ে আমরা গেলাম সিটং-এর কমলালেবুর বাগানে।

জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ অব্দি সিটং-এ গাছ ভর্তি কমলা লেবু দেখতে পাওয়া যায়। কমলা লেবুর বাগানে কিছুটা সময় কাটিয়ে বিকেল ৫টা নাগাদ আমরা NJP ফিরে এলাম বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে। দুরাত আর ৩দিনের এই ঝটিকা সফরে আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম তা আমাদের কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here