in-the-secluded-forest
in-the-secluded-forest

লেখক, অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায় :

শীতের ছুটিতে গেছিলাম ঘাটশিলা । আমরা তিনজন – আমি , আমার স্ত্রী আর আমার মেয়ে । গাড়িতে স্টার্ট দিলাম সকাল  সাতটা । ব্রেকফাস্ট  কোলাঘাটে একটা রেস্টুরেন্টে ।উঠেছিলাম  ফুলডুঙরি থেকে ব্রিজের তলা দিয়ে বিপরীত দিকে দশ – বারো কিলোমিটার ভেতরে । আদিবাসী অধ্যুষিত  দিঘিয়া গ্রামে এক অতি মনোরম রিসর্টে । রিসর্টে যাওয়ার দুটো রাস্তা । একটা আদিবাসী গ্রামের ভেতর দিয়ে আর একটা ফুলডুঙরি থেকে অনেকটা এগিয়ে তারপর ডানদিকে ব্রিজের তলা দিয়ে । তবে দ্বিতীয় রাস্তাটা ভালো এবং চালু । আমরা অবশ্য প্রথম রাস্তাটা ধরে আদিবাসী গ্রামে ঢুকে ছিলাম । সঙ্কীর্ণ এবং বিপদজনক । রিসর্টটা খুবই সুন্দর। রিসর্টের ভেতর এবং বাইরের প্রাকৃতিক শোভা মন কেড়ে নেয় । অনতিদূরে দলমা  পাহাড় বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আছে একবুক গাছ নিয়ে । চাইলেই উঠতে পারা  যায় পাহাড়ে ।

যারা নির্জনতা পছন্দ করেন ,তাদের জন্য এই স্থান একেবারে স্বর্গপুরী । দ্বিতীয় দিন  সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম । পায়ে হাঁটা  দূরত্বে বুরুডি লেক ।  ওটা পরে  দেখবো , ফেরার পথে ।  গাইড হিসাবে সাথে নিলাম একটি স্থানীয় ছেলেকে । প্রথমে গেলাম সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের বাড়ি , ” গৌরী  কুঞ্জ ” । সাহিত্য রসিক বাঙালির এ এক দুর্বল স্থান । অতি  প্রিয় ।  বাড়িটি একটি সংগ্রহশালা  । লেখকের ব্যবহৃত সামগ্রী এবং তাঁর  লেখা বই সংগ্ৰহ করে রাখা হয়েছে । জমির শেষ প্রান্তে লেখকের পুত্র তারাদাস বন্দোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত একটি মঞ্চ আছে যার নাম ” অপুর পাঠশালা ” । রাজ্যটা ঝাড়খন্ড এবং ভাষা হিন্দি হলেও আপনার  মনে হবে আপনি বাংলার কোনো স্থানে এসেছেন । বাংলা ভাষার বহুল  প্রয়োগ । আপনার ভালোই লাগবে ।

এরপর  হিন্দুস্থান কপার  লিমিটেডকে বা হাতে রেখে সামনে  সুবর্ণরেখা নদীর ওপরে  একটা ছোট ব্রিজ অতিক্রম করে ডান  দিকে  নেমে এলাম নিচে । আরও  নিচে আবার ডান  দিকে ঘুরে একটা ফাঁকা জমিতে গাড়ি পার্ক করে হেঁটে  এগিয়ে গেলাম সুবর্ণরেখা নদীকে ছুঁতে  । দুচোখ ভোরে উপভোগ করলাম সুবর্ণরেখার স্নিগদ্ধ ,নির্মল শীতলতা । আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল ‘ গালুডি ড্যাম ‘ ।

“গালুডি ড্যাম “কে অতিক্রম করে  ব্রিজের ওপর দিয়ে  ওপারে  গিয়ে  এপারকে দেখা । আনুমানিক পাঁচ কিলোমিটার ড্রাইভ । মুগদ্ধ  হতেই   হবে । অসাধারন দৃশ্য । অনতি দূরে পাহাড় । পাহাড়ের আগে জঙ্গল । বিস্তীর্ন ফাঁকা জমি । তার কাঁটার জালে ঘেরা । পিচ ঢালা পথ চলে গেছে  মুসাবনীর  দিকে । আমরা ঐ  পথেই যাবো । ওপরে  শান্ত পরিবেশ । নিচে ড্যামে আটকা পড়া জলরাশির ছটফটানি । হিংস্র সাপিনীর মত তার হিস্ হিস্ শব্দ । মনে হয় চুপচাপ বসে   থাকি । থাকতে পারলাম না । যেতে তো হবেই । সময়ের বেড়াজালে  আবদ্ধ । ড্যামকে পেছনে ফেলে রাস্তা ঘুরেছে  । রাস্তাটা খুব সুন্দর । চলেছি  মুসাবনীর  দিকে । যাবো  জাদুগোড়া ” রঙ্কিনি মাতার মন্দির  ” । মন্দিরে যাওয়ার পথ গেছে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে । কিন্তু ভয় লাগে  না । দলমা  পাহাড় চলেছে সাথে সাথে । দুপাশে সবুজের সমারহ । তার ই মাঝে মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে রঙিন বুনো ফুল ।  এক অদ্ভুত ভালো  লাগায় আছন্ন হয়ে যায় সমস্ত মন প্রাণ । কথা যায় হারিয়ে । উপলব্ধি করি যে নীরবতাই মুগ্ধ্তা প্রকাশের শ্রেষ্ঠ ভাষা ।

এক সময় প্রবেশ করি জাদুগোড়া শহরে । এবার হাইওয়ে ধরে এগোনো । পথ চলে যায় আমাদের ছেড়ে । দাঁড়িয়ে পরি হাইওয়ের ওপরে । এসে পৌঁছাই  মন্দিরের কাছে । রাস্তার পাশেই লম্বাটে মন্দির ।  খুবই বিপদ জনক অবস্থান এই মন্দিরের । মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে  মাইন্ শহর । অবিরত ট্রাকের যাতায়াত । প্রতি মুহূর্তে বিপদ । বিপদকে মাথায় নিয়েই অবিন্যস্ত রাস্তা  পারাপার । এ পাশে বিক্রি হচ্ছে পুজোর সামগ্রী আর ওপারে  মায়ের মন্দির । অনেকগুলো গর্ভগৃহ ।  না না দেব দেবীর মূর্তি । অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই স্থানের সাথে । এমনও  শোনা যায় যে বহু পূর্বে এখানে একটা পাথর ছিল । মায়ের নামে  সেই পাথরের ওপর নরবলি হত । ব্রিটিশ সরকারের শাসন কালেই বন্ধ হয় নরবলি । তখন পুজো হত পাথরে । পূজারী ছিল আদিবাসী সম্প্রদায় ভুক্ত । স্বাধীনতার পরে আনুমানিক ১৯৫০ সালে নির্মিত হয় বর্তমান মন্দিরটি  । মূল মন্দিরের প্রবেশ পথের ওপরে দেওয়ালে মা দুর্গার মূর্তি । দূর্গা মা ই রঙ্কিনি মাতা ।

এবার রিসর্টে ফেরা । তার আগে যেতে হবে বুরুডি লেক । সেখানে আর যাওয়া হয় নি । ফেরার পথে গালুডি ড্যাম অতিক্রম করে আসার  কিছুটা পরেই  থেমে  গেল আমার গাড়ি । বনেট তুলে দেখি ধোঁয়া । চেক করতে গিয়ে বুঝলাম ক্ল্যাচ  অয়ার পুড়ে গেছে । মেকানিক অথবা গ্যারাজ ছাড়া উপায় নেই । এমন একটা জায়গায় গাড়ি খারাপ হয়েছে যার পাঁচ কিলো মিটারের মধ্যে কোনো কিছু নেই । বসে বসে ভাবতে ভাবতেই সন্ধ্যে হবো হবো । একটা টাটাসুমোর আগমন ঘটলো । গাড়িটা থামালাম । নেমে এলেন দু’জন বিহার নিবাসী ভদ্রলোক । সব দেখে শুনে এবং পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে আমাদের উদ্ধার করতেই মনস্থির করলেন । একটা লোহার তারের সাহায্যে আমাদের গাড়িটা তার গাড়ির সাথে বেঁধে টেনে নিয়ে চললেন । মাঝপথে নেমে গেলেন দুই ভদ্রলোক । তাদের বাড়ির রাস্তা অন্য দিকে । একটা অটো  ধরে চলে যাবেন । আমরা যাবো মারুতির শোরুমে । কুড়ি -পঁচিশ কিলোমিটার দূরে । ফুলডুঙরিতে । সেখান থেকে আমাদের রিসর্ট আরো দশ -বারো কিলোমিটার । ভদ্রলোক ড্রাইভারকে বলে গেলেন গাড়ি শোরুমে ঢুকিয়ে আমাদের যেন একদম রিসর্টে পৌঁছে দিয়ে আসে । সে যত  রাত্রি হয় হোক । ড্রাইভার ছেলেটি তাই করলো । গাড়ি শোরুমে রেখে আমরা যখন রিসর্টে ফিরলাম ঘড়িতে তখন সময় রাত্রি  পৌনে আটটা ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here