Netaji Subhas chandra bose by Nirupam majumder
Subhash chandra bose by Nirupam majumder

ছবিঃ নিরুপম মজুমদার

লেখকঃ বৈশাখী দাস

অরণ্যে তুমি সাজালে সৈন্যবাহিনী,
তোমারে কাহিনী সাজাও তরণী,
মরনি মরনি, তুমি তো মরনি
সংকল্পের রাশটা ছাড়োনি,
জাগালে, দেখালে ভারতীয় প্রাণে
শেখালে, পড়ালে দেশটার মানে,
অমর হলে যে অন্তর্ধান-এ
রক্ত এখনো তপ্ত
হয়নি এখনো তৃপ্ত
ইতিহাস অভিশপ্ত গুপ্ত,
গুপ্ত গল্প সুপ্ত এদেশে,
সুভাষকে বোঝা শক্ত…!
সুভাষকে বোঝা শক্ত….!

মধ্যরাতে এলগিন রোডের তিন তলার ঘরে তখন আলো জ্বলছিল,
চাদর গায়ের এক ছায়ামূর্তি পায়চারি করছিল অবিরাম,বাইরের রাস্তায় ইংরেজ পুলিশের চর
সতর্ক সজাগ চোখে দেখছিল।
তার সব সতর্কতাকে বুদ্ধু বানিয়ে সুভাষ তখন অন্ধকার চিরে ছুটে চলেছে আলোর পথে,
দেশের মানুষ, কাকপক্ষী কেউ টের পায়নি।

সে চলে যাবার পর সেই থেকে প্রত্যেক জানুয়ারিতে পৃথিবীর এপাড়া, ও পাড়া সব মাটিতে তাঁর অনশ্বর পায়ের ছাপ। সব রাইফেলে তাঁর বুকের বারুদ
সব কুচকাওয়াজে তাঁর সেনার ছন্দ
পরশ পাথরের মত স্বাধীনতাকে খুঁজেছে
তাঁর অন্তরে লুকিয়ে থাকা খ্যাপা।

তাঁর গন্তব্য ছিল স্বাধীনতা
তাঁর পথ ছিল স্বাধীনতা
তাঁর স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতা
তাঁর প্রেম ছিল স্বাধীনতা।

তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক চিরস্মরণীয় কিংবদন্তি নেতা । তিনি নেতাজি নামে সমধিক পরিচিত।

১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জানুয়ারি, তাঁর পিতার কর্মস্থল বর্তমান ওড়িশা রাজ্যের কটক শহরে (ওড়িয়া বাজার) একটি দক্ষিণ রাঢ়ী কায়স্থ বংশে জন্মগ্রহণ করেন সুভাষচন্দ্র বসু।

তিনি ছিলেন কটক-প্রবাসী বিশিষ্ট বাঙালি আইনজীবী জানকীনাথ বসু ও প্রভাবতী দেবীর চৌদ্দ সন্তানের মধ্যে নবম। তাঁদের পৈত্রিক নিবাস ছিল ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার কোদালিয়া (বর্তমানে সুভাষগ্রাম-এর অন্তর্ভূক্ত)৷

সুভাষচন্দ্র ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কলকাতা থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি।

১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে সাম্মানিকসহ বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রাবস্থা থেকে তিনি তার দেশপ্রেমিক সত্তার জন্য পরিচিত ছিলেন।

এরপর সুভাষচন্দ্র কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজউইলিয়াম হলে উচ্চশিক্ষার্থে ভরতি হন। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ভাল নম্বর পেয়ে তিনি প্রায় নিয়োগপত্র পেয়ে যান।

কিন্তু বিপ্লব-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সেই নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “কোনো সরকারের সমাপ্তি ঘোষণা করার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা হল তা থেকে [নিজেকে] প্রত্যাহার করে নেওয়া”।

সুভাষচন্দ্র পরপর দু’বার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে আদর্শগত সংঘাত এবং কংগ্রেসের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা বিরুদ্ধ-মত প্রকাশ করার জন্য তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়।

subhas chandra bose netaji

সুভাষচন্দ্র মনে করতেন, মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার এবং সত্যাগ্রহ নীতি ভারতের স্বাধীনতা আনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এই কারণে তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

সুভাষচন্দ্র ফরওয়ার্ড ব্লক নামক একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের পূর্ণ ও সত্বর স্বাধীনতার দাবি জানাতে থাকেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে এগারো বার কারারুদ্ধ করেছিল।

তাঁর বিখ্যাত উক্তি “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো।”

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরেও তাঁর মতাদর্শের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি বরং এই যুদ্ধকে ব্রিটিশদের দুর্বলতার সুবিধা আদায়ের একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন।

যুদ্ধের সূচনালগ্নে তিনি লুকিয়ে ভারত ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি ও জাপান ভ্রমণ করেন ভারতে ব্রিটিশদের আক্রমণ করার জন্য সহযোগিতা লাভের উদ্দেশ্যে।

জাপানিদের সহযোগিতায় তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ পুনর্গঠন করেন এবং পরে তার নেতৃত্ব দান করেন।

subhas chandra bose 2

এই বাহিনীর সৈনিকেরা ছিলেন মূলত ভারতীয় যুদ্ধবন্দি এবং ব্রিটিশ মালয়, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত মজুর।

জাপানের আর্থিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তায় তিনি নির্বাসিত আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্বদান করে ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে ইম্ফল ও ব্রহ্মদেশে (বর্তমান মায়ানমার) যুদ্ধ পরিচালনা করেন।

ভগৎ সিংয়ের ফাঁসি ও তাঁর জীবন রক্ষায় কংগ্রেস নেতাদের ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ সুভাষচন্দ্র গান্ধী-আরউইন চুক্তি বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। তাকে কারারুদ্ধ করে ভারত থেকে নির্বাসিত করা হয়। নিষেধাজ্ঞা ভেঙে তিনি ভারতে ফিরে এলে আবার তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়।

প্রায় বিশ বছরের মধ্যে সুভাষ চন্দ্র মোট ১১ বার গ্রেফতার হয়েছিলেন।

১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে দেশবন্ধু যখন কলকাতা পৌরসংস্থার মেয়র নির্বাচিত হন, তখন সুভাষচন্দ্র তার অধীনে কর্মরত ছিলেন। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে অন্যান্য জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে তাকেও বন্দি করা হয় এবং মান্দালয়ে নির্বাসিত করা হয়। এখানে তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

সুভাষচন্দ্র ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ হিন্দু। তিনি ধ্যানে অনেক সময় অতিবাহিত করতেন। স্বামী বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

subhash chandra bose win

১৯৩০ সালে তিনি কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৪ সালে লবণ সত্যাগ্রহবন্ধ করলে তিনি ও বীঠলভাই প্যাটেল ইউরোপ থেকে বোস প্যাটেল ইস্তাহার দেন।

তাকে ভারত ও রেঙ্গুনের বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছিল। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তাকে ইউরোপে নির্বাসিত করা হয়। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তার প্রথম প্রেম এমিলি শেঙ্কল-এর সঙ্গে পরিচিত হন ভিয়েনামে। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তারা ব্যাড গ্যাস্টিনে বিয়ে করেন।

তাঁর পিতার মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সরকার তাকে শুধু মাত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের উদ্দ্যেশে কিছুক্ষণের জন্য কলকাতায় আসার অনুমতি দেয়। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি গান্ধীর বিরোধিতার মুখে ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দ্বিতীয় বারের জন্য ত্রিপুরা অধিবেশনে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন।

এই নির্বাচনে গান্ধী পট্টভি সীতারামায়াকে সমর্থন দেন নির্বাচনের ফলাফল শোনার পর গান্ধী বলেন “পট্টভির হার আমার হার”। কিন্তু জয়যুক্ত হলেও তিনি সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদন করতে পারছিলেননা। গান্ধীর অনুগামীরা তার কাজে বাধা সৃষ্টি করছিলেন। গোবিন্দ বল্লভ পন্থ এই সময় একটি প্রস্তাব পেশ করেন যে, “কার্যনির্বাহক পরিষদকে পুনর্গঠন করা হোক”।

ভয়কে হারালে নির্মমভাবে, জয়ের পথটা সোজা দেখা যাবে।

এভাবে সুভাষচন্দ্র বসু এই নির্বাচনে জয়লাভ করলেও গান্ধীর বিরোধিতার ফলস্বরূপ তাকে বলা হয় পদত্যাগ পত্র পেশ করতে; নইলে কার্যনির্বাহী কমিটির সকল সদস্য পদত্যাগ করবে। এই কারণে তিনি নিজেই কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেণ এবং অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেন।

১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জাতীয় পরিকল্পনা পরিষদের প্রস্তাবনা দেন। ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে গান্ধী সহ অন্য নেতৃবৃন্দ এতে অংশ নিলেও পূর্বের মত স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না।

সুভাষচন্দ্র বসুর সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি হল, “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” (হিন্দিতে, তুম মুঝে খুন দো, ম্যায় তুমহে আজাদি দুঙ্গা)। ৪ জুলাই ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে বার্মাতে এক র‌্যালিতে তিনি এই উক্তি করেন। তার আর

একটি বিখ্যাত উক্তি হল ‘ভারতের জয়’ (‘জয় হিন্দ’), যা কিনা পরবর্তীতে ভারত সরকার গ্রহণ করে নেয়।

একটি মতে নেতাজি সোভিয়েত রাশিয়ার কাছে বন্দি অবস্থায়, সাইবেরিয়াতে মৃত্যুবরণ করেন। আর একটি মতে, বর্তমানে রেনকোজি মন্দিরে রাখা নেতাজির চিতাভস্ম পরীক্ষা করে জানা গিয়েছে -ওই চিতাভস্ম নেতাজির নয়।

আসলে ভারতবর্ষে নেতাজির তুমুল জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একদল উঁচুতলার ভারতীয় নেতা(জওহরলাল নেহেরু) এবং ইংরেজ সরকার মিলিতভাবে ষড়যন্ত্র করে নেতাজিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়।

তাই ভারতীয় সরকার কখনো নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রকৃত মৃত্যুর কারণ জনসমক্ষে আনেননি। অনেকের মতে ফৈজাবাদের ভগবান জি ওরফে গুমনামি বাবা হলেন নেতাজি । কিন্তু এ ব্যাপারটি আজও স্পষ্ট নয়। কারো কারো মতে নেতাজি নাকি আজো ও জীবিত রয়েছে।

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মদিনের আগে বড় ঘোষণা কেন্দ্রীয় সরকারের। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, নেতাজির জন্মদিনকে এবার থেকে ‘পরাক্রম দিবস’ হিসাবে পালন করবে কেন্দ্রীয় সরকার। গোটা দেশের সঙ্গে বিদেশেও উজ্জাপিত হবে দিনটি।

নেতাজির জন্মদিনে জাতীয় ছুটি ঘোষণার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সরব পশ্চিমবঙ্গ। দেশের আইকনকে শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর জন্মদিন ২৩ জানুয়ারিকে জাতীয় ছুটি ঘোষণার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here